সোমবার, ০৮ Jun ২০২৬, ০৪:৪২ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ সংবাদ :
বাড়ইকান্দি পবিত্র ঈদুল-আযহা উপলক্ষে নাইট প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বিবাহিত বনাম অবিবাহিত খেলা অনুষ্ঠিত গৌরনদীতে জিয়াউর রহমান’র শাহদাত বার্ষিকী পালন গাঁজা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে রিপোর্ট করায় ফেসবুকে হুমকি থানায় মামলার আবেদন। তজুমদ্দিনে অস্ত্র, কার্তুজ ও রকেট ফ্লেয়ারসহ কুখ্যাত ডাকাত হেজু গ্রেফতার। বরিশালে প্রেমিকের বাসায় গিয়ে খুন হলেন প্রেমিকা উজিরপুরে মামলার এক বছর: আসামি গ্রেফতারে পুলিশের বিরুদ্ধে অনীহার অভিযোগ ইউএনও ও সাংবাদিকের যৌথ উদ্যোগে মাথা গোঁজার ঠাঁই ও কর্মসংস্থান পেলেন অসহায় মাহিনুর বাকেরগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধে হামলায় যুবকের মৃত্যু বরিশালের জেল খাল গিলে খাচ্ছে বহুতলা ভবন: নেপথ্যে সিটি কর্পোরেশনের ‘দুর্নীতিবাজ’ চক্র! পৌরসভার ময়লা পরিষ্কার করে সংসার চালান বিধবা তাহমিনা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন সম্পন্ন ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে নারীর অংশ বাড়ছে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছেছে জ্বালানিবাহী ৮ জাহাজ আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি আসামির নারায়ণগঞ্জ ভূমি বারান্দায় প্রতিমন্ত্রী
সারাদেশে অদৃশ্য চাপে আত্মহননের পথে অল্প বয়সিরা

সারাদেশে অদৃশ্য চাপে আত্মহননের পথে অল্প বয়সিরা

সারাদেশে অদৃশ্য চাপে আত্মহননের পথে অল্প বয়সিরা
সারাদেশে অদৃশ্য চাপে আত্মহননের পথে অল্প বয়সিরা

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অল্প বয়সিদের আত্মহননের ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রভাব এবং মেধা অনুযায়ী সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ঘাটতি-সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের ওপর তৈরি হচ্ছে এক অদৃশ্য চাপ। সেই চাপ সামাল দিতে না পেরে কেউ কেউ বেছে নিচ্ছে চরম পথ।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে স্কুল পর্যায়ের ১৯০ জন, কলেজের ৯২ জন, মাদ্রাসার ৮৮ জন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৭ জন। ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যা বেশি। সংগঠনের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সিদের মধ্যেই এর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। পুলিশ সদর দপ্তরের এক পরিসংখ্যান বলছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪১ জনের বেশি মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। সরেজমিন ঢাকার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১২ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এর মধ্যে মাধ্যমিকের পাঁচজন, উচ্চ মাধ্যমিকের চারজন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন। তাদের কথায় উঠে এসেছে, পারিবারিক প্রত্যাশা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। ভালো ফল, নামি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি, দ্রুত প্রতিষ্ঠা-এসব লক্ষ্য যেন জীবনের একমাত্র মানদণ্ড। মাধ্যমিকের এক শিক্ষার্থী যুগান্তরকে বলেন, একটি পরীক্ষায় খারাপ করলে মনে হয় সব শেষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জানান, চাকরির অনিশ্চয়তা ও আত্মীয়স্বজনের নানা প্রশ্ন মানসিক চাপ বাড়ায়।

জানা গেছে, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী, কলেজগামী তরুণ-তরুণী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী-তাদের বয়স অল্প, কিন্তু স্বপ্ন অনেক বড়। বাইরে থেকে তারা প্রাণবন্ত, আড্ডায় সরব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। কিন্তু পরিবারের অজান্তেই তাদের কারও কারও ভেতরে জমে ওঠে অদৃশ্য সংকট। দীর্ঘদিনের হতাশা, অভিমান, একাডেমিক চাপ, প্রেমঘটিত টানাপোড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, মানসিক অস্থিরতা, এমনকি যৌন নির্যাতনের মতো অভিজ্ঞতা অনেকের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেই কষ্ট প্রকাশ পায় না। নীরবে সেই কষ্ট জমতে জমতে একসময় তা ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ প্রবণতার পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। তা হলো-কাঠামোগত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। উচ্চশিক্ষা শেষে যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের হতাশ করছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, পরিবারের প্রত্যাশা ও সামাজিক তুলনা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির অমিল আত্মহননের বড় কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিযোগিতানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা তরুণদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ভর্তি পরীক্ষা, কোচিং, ফলাফলের দৌড়-সব মিলিয়ে নম্বরই হয়ে উঠছে পরিচয়ের মাপকাঠি। সামান্য পিছিয়ে পড়লেই আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরে। অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং সেবা না থাকায় শিক্ষার্থীরা মনের কথা বলার নিরাপদ জায়গাও পায় না।

তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বৃদ্ধির পেছনে সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন গেমিং এবং এমনকি অনলাইন জুয়ার প্রভাব রয়েছে। এসব আসক্তি পড়াশোনায় অনীহা তৈরি করে এবং পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণে পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করে। এছাড়া অপসংস্কৃতির প্রভাবও আরেকটি বড় কারণ। চলচ্চিত্র বা বিভিন্ন অনলাইন কন্টেন্টে আত্মঘাতী হওয়া বা নিজেকে জখম করার দৃশ্যগুলো তরুণ-তরুণীদের মানসিকভাবে প্রভাবিত করছে, যা বাস্তব জীবনে সংকটে পড়লে তারা অনুকরণ করার চেষ্টা করে। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে অন্যের সাজানো সাফল্য ও আনন্দের ছবি দেখে অনেক তরুণ-তরুণী নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভাবতে শুরু করে। ‘লাইক’ ও ‘কমেন্ট’নির্ভর আত্মমর্যাদা হয়ে ওঠে ভঙ্গুর। আবার সাইবার বুলিং বা অনলাইন অপমান অনেককে গভীরভাবে আঘাত করে। সেই নীরবতা পরিবারও অনেক সময় বুঝতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তার মতে, মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানজনক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার বয়সোপযোগী করার দিকেও নজর দিতে হবে। আত্মহননের প্রবণতা দেখা দিলে লোকলজ্জা না করে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, আত্মহননের সিদ্ধান্ত হঠাৎ আসে না। আচরণে পরিবর্তন, অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে যাওয়া, আগ্রহ হারানো, ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসে অস্বাভাবিকতা বা মৃত্যুচিন্তার ইঙ্গিত-এসব লক্ষণ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে কাউন্সেলিং ও পারিবারিক সমর্থন পেলে অধিকাংশ সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সূত্র জানিয়েছে, একই ছাদের নিচে থেকেও অনেক পরিবারে কথোপকথন কমে গেছে।

প্রযুক্তিনির্ভরতা ও ব্যস্ততার কারণে প্রজন্মগত দূরত্ব বাড়ছে। অনেক কিশোর-কিশোরী মনে করে, তাদের কথা শোনার সময় কারও নেই। এই অশ্রুত বোধ একসময় গভীর একাকিত্বে রূপ নেয়। আর একাকিত্বই হয়ে ওঠে বড় ঝুঁকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক সহমর্মিতা বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর কাউন্সেলিং সেল চালু, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাক্রমে জীবনদক্ষতা অন্তর্ভুক্তি এখন জরুরি। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয় ছাড়া এ অদৃশ্য সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।

আরো পড়ুন

নিউজটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন




© All rights reserved © অনুসন্ধান24 -২০১৯